এক রুটির দাম যখন বিলিয়ন ডলার: জিম্বাবুয়ের মুদ্রার অবিশ্বাস্য উত্থান-পতনের গল্প

webmaster

짐바브웨 화폐 역사 - **Prompt 1: Dawn of a New Era - Zimbabwe's First Currency**
    An uplifting, vibrant scene depictin...

বাংলা ব্লগের প্রিয় বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আশা করি আমার এই ছোট্ট ডিজিটাল আস্তানায় আপনারা সবাই দারুণ সময় কাটাচ্ছেন। আমি সবসময় চেষ্টা করি এমন কিছু নতুন আর কাজের কথা নিয়ে আসতে, যা আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে সত্যিই উপকারে আসে এবং আপনাদের কৌতূহল মেটায়। সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আর অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি দেখে আমার মনে হয়, আমাদের সামনে আসছে এক নতুন দিগন্ত। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে গা ভাসাতে হলে নিজেদের আপডেট রাখাটা খুব জরুরি, তাই না?

짐바브웨 화폐 역사 관련 이미지 1

আমি নিজেও যখন নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে গবেষণা করি, তখন অবাক হয়ে যাই কত দারুণ তথ্য আর ভবিষ্যৎ প্রবণতা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। আজকের দিনে শুধু তথ্য জানাটাই যথেষ্ট নয়, সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই আসল স্মার্টনেস। তাই আপনাদের জন্য আমি প্রতিনিয়ত খুঁজে আনি সেইসব কার্যকরী টিপস আর ট্রেন্ডি বিষয়, যা আপনাকে এক ধাপ এগিয়ে রাখবে। এই ব্লগে আপনারা পাবেন আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর গভীর বিশ্লেষণের এক দারুণ সংমিশ্রণ, যা শুধু তথ্য দেবে না, বরং আপনাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। চলুন, জ্ঞান আর বিনোদনের এই যাত্রায় আমরা সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যাই!

প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের সাথে এমন এক দেশের গল্প শেয়ার করব, যার মুদ্রার ইতিহাস শুনলে আপনারা চমকে যাবেন! জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে টাকার উত্থান-পতনের গল্পটা যেন এক রোলার কোস্টারের মতো, যেখানে প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। এই ইতিহাস শুধু সংখ্যা বা অর্থনীতির চার্ট নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের জীবনের বাস্তব সংগ্রাম আর টিকে থাকার গল্প। মুদ্রার এই দীর্ঘ এবং কখনও কখনও হৃদয়বিদারক যাত্রা আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পাঠ শেখায়। চলুন, এই আকর্ষণীয় কিন্তু জটিল ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার পথে: মুদ্রার এক নতুন যাত্রা

প্রিয় বন্ধুরা, জিম্বাবুয়ের মুদ্রার ইতিহাসের গভীরে ডুব দিতে গেলে প্রথমেই আমাদের তাকাতে হবে ঔপনিবেশিক শাসনের দিনগুলোর দিকে। রোডেশিয়া তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে, আর এখানকার মুদ্রা ছিল রোডেশিয়ান ডলার। আমি যখন বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ইতিহাস ঘাঁটাঘাটি করি, তখন দেখি প্রতিটি দেশের মুদ্রার শুরুটা প্রায় একইরকম হয়—একটি শক্তিশালী বিদেশি মুদ্রার অনুকরণে বা তার সাথে সম্পর্ক রেখে। রোডেশিয়ান ডলারও ঠিক সেভাবেই শুরু হয়েছিল, যা সে সময় কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সে সময়কার মানুষদের মধ্যে ভীষণভাবে কাজ করছিল, ঠিক যেমনটা আমরা অনেক সময় নিজেদের জীবনেও অনুভব করি, নতুন কিছু শুরু করার আগে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। এই সময়টার অর্থনীতি শুধু সংখ্যার খেলা ছিল না, ছিল ভবিষ্যতের জন্য এক বুনিয়াদ গড়ার চেষ্টা। পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন কিছু তৈরি করার একটা উত্তেজনা তখন সর্বত্র বিদ্যমান ছিল, যা জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই সময় থেকেই আসলে জিম্বাবুয়ের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিচয়ের খোঁজে যাত্রা শুরু হয়েছিল, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আমরা পরেও দেখেছি।

স্বাধীন জিম্বাবুয়ের প্রথম মুদ্রা: আশার আলো

১৯৮০ সালে জিম্বাবুয়ে স্বাধীনতা লাভ করার পর, রোডেশিয়ান ডলারের পরিবর্তে চালু হলো জিম্বাবুয়ে ডলার। আমার মনে আছে, তখন এই নতুন মুদ্রা নিয়ে মানুষের মধ্যে কত আশা আর স্বপ্ন ছিল! একটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব মুদ্রা, এর থেকে বড় গর্বের বিষয় আর কী হতে পারে? শুরুর দিকে জিম্বাবুয়ে ডলার বেশ শক্তিশালী ছিল, এমনকি মার্কিন ডলারের চেয়েও বেশি মূল্য ছিল কিছু সময়ের জন্য। ভাবা যায়, এই ঘটনাটা আসলে আমাদের শেখায় যে, যেকোনো নতুন শুরুর প্রথম দিকে সম্ভাবনা কতটা উজ্জ্বল থাকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে দেশটি তখন বেশ ভালো করছিল, যার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল মুদ্রার ওপর। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই সময়টা ছিল জিম্বাবুয়ের অর্থনীতির সোনালী অধ্যায়গুলোর মধ্যে একটি, যখন সঠিক নীতি আর জনগণের পরিশ্রম দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। মানুষজন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, এবং নতুন দেশ হিসেবে জিম্বাবুয়ের বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল। এই সময়কার অর্জনগুলো পরবর্তী অনেক বছর ধরে দেশটির অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছিল, যদিও পরে অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছিল।

কাঠামো ও প্রাথমিক অর্থনৈতিক নীতি

নতুন জিম্বাবুয়ে ডলার চালু হওয়ার পর দেশটির সরকার কিছু শক্তিশালী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। সত্যি বলতে কি, যেকোনো নতুন দেশের জন্য এই দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি যখন অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করি, তখন দেখেছি যে, শুরুর দিকে অনেক দেশই বিদেশি মুদ্রার উপর নির্ভরতা কমাতে এবং নিজেদের মুদ্রাকে শক্তিশালী করতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়। জিম্বাবুয়েও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ব্যাংক অব জিম্বাবুয়ে কঠোরভাবে মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল এবং কৃষি খাতের উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হচ্ছিল। এসব পদক্ষেপের ফলে প্রাথমিক বছরগুলোতে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। দেশের মানুষজন ধীরে ধীরে নতুন মুদ্রার সাথে অভ্যস্ত হচ্ছিল এবং বাজারের উপর তাদের আস্থা বাড়ছিল। আমার মনে হয়, এই সময়টা থেকেই জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে এক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এই দৃঢ় অর্থনৈতিক কাঠামোই প্রাথমিকভাবে দেশকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে রেখেছিল।

অর্থনৈতিক সংস্কারের চাপ ও মুদ্রাস্ফীতির পদধ্বনি

স্বাধীনতার পর জিম্বাবুয়ে যে অর্থনৈতিক গতি নিয়ে চলছিল, তা বেশিদিন টেকেনি। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এসে অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে শুরু করে। আমার নিজের চোখে দেখেছি, অনেক সময় একটি দেশের অর্থনীতিতে যখন হঠাৎ করে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন আসে, তখন তার ফল ভালো-মন্দ দুটোই হতে পারে। জিম্বাবুয়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি, বিশেষ করে ভূমি সংস্কারের মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে শুরু করে এবং কৃষিখাত, যা একসময় জিম্বাবুয়ের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল, তাতে ব্যাপক ধস নামে। মনে হচ্ছিল, যেন একটি বড় ভূমিকম্পের পর সবকিছু নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। এই সময়টা থেকেই মুদ্রাস্ফীতির বীজ বোনা শুরু হয়েছিল, যা পরে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সরকার যখন আয় কমার বিপরীতে ব্যয় কমাতে পারছিল না, তখন তারা মুদ্রা ছাপানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর এখান থেকেই আসলে সমস্যার সূত্রপাত। আমি দেখেছি, যখন কোনো দেশ এই পথে হাঁটে, তখন মুদ্রার ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, যা পরবর্তীতে অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তোলে।

ভূমি সংস্কার ও এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া

জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হলো ভূমি সংস্কার কর্মসূচি। ২০০০ সালের আশেপাশে এই কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করা হয়। শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের কাছ থেকে জমি নিয়ে আফ্রিকানদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। আমার মনে আছে, এই খবরগুলো তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খুব আলোচিত হতো। আমি যখন এমন বড় ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা ভাবি, তখন বুঝতে পারি এর তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে। এই সংস্কারের ফলে একদিকে যেমন সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠেছিল, তেমনই অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যায়। বহু অভিজ্ঞ কৃষক দেশ ছেড়ে চলে যান, আর নতুন কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা অভিজ্ঞতা ছিল না। এর ফলস্বরূপ, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তামাকসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে। আমি মনে করি, এই ঘটনা জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিকে এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছিল, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো খুব কঠিন ছিল। এই সময়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও বিনিয়োগের অভাব

ভূমি সংস্কার কর্মসূচির পর জিম্বাবুয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়ে। অনেক পশ্চিমা দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা জিম্বাবুয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আমার নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে বলতে পারি, যখন কোনো দেশ আন্তর্জাতিক সমর্থন হারায়, তখন তার অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বিদেশি ঋণ পেতে সমস্যা হয়, নতুন প্রযুক্তি আসে না, আর বাজার হারাতে শুরু করে। জিম্বাবুয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই হয়েছিল। বিনিয়োগের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হতে শুরু করে, বেকারত্ব বাড়তে থাকে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আমি যখন এমন পরিস্থিতি দেখি, তখন মনে হয় যেন একটি চাকার সব স্পোক ভেঙে যাচ্ছে, আর চাকাটা আর ঘুরতে পারছে না। সরকার তখন বাধ্য হয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে আরও বেশি করে টাকা ছাপাতে শুরু করে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়। এই সময়টাতেই জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে এক গভীর সংকট শুরু হয়, যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ।

Advertisement

মুদ্রাস্ফীতির ভয়ংকর রূপ: যখন টাকা মূল্যহীন হয়ে পড়ে

জিম্বাবুয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে লোমহর্ষক অধ্যায় হলো অতি-মুদ্রাস্ফীতি। আমার নিজের জীবনে এমন ঘটনা চোখে দেখিনি, কিন্তু যখন এর গল্প শুনি বা তথ্যচিত্র দেখি, তখন গা শিউরে ওঠে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জিম্বাবুয়ের মুদ্রাস্ফীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মাসে প্রায় ৭৯.৬ বিলিয়ন শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি! ভাবুন তো, সকালে এক ব্যাগ আলু যে দামে কিনছেন, দুপুরে সেই দাম হয়তো দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমি যখন এই তথ্যগুলো পড়ি, তখন মনে হয়, সাধারণ মানুষের জীবন তখন কতটা কঠিন ছিল। টাকা পকেটে নিয়ে দোকানে গেলে দেখা যেত, একটি পাউরুটি কেনার জন্যও লক্ষ লক্ষ, এমনকি কোটি কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে। এই সময়টায় জিম্বাবুয়ে ডলার তার সমস্ত মূল্য হারিয়ে ফেলেছিল, কাগজের টুকরো ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মানুষ বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেত, যা দিয়ে হয়তো এক বোতল কোক কেনা যেত। এই পরিস্থিতিটা আমাদের শেখায়, একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মুদ্রার প্রতি বিশ্বাস না থাকলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

একশো ট্রিলিয়ন ডলারের নোট: একটি দুঃখজনক বাস্তবতা

অতি-মুদ্রাস্ফীতির সময় জিম্বাবুয়ে সরকার একের পর এক উচ্চ মূল্যমানের নোট চালু করতে থাকে। আমার নিজের মনে আছে, একবার আমি একটি ডকুমেন্টারিতে দেখেছিলাম, কিভাবে ১০০ ট্রিলিয়ন জিম্বাবুয়ে ডলারের নোট ছাপানো হয়েছিল। কল্পনা করতে পারেন, ১০০,০০০,০০০,০০০,০০০! এই নোটগুলো তখন কেবল স্মৃতিচিহ্ন বা পর্যটকদের আকর্ষণের বস্তুতে পরিণত হয়েছিল, কারণ দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো মূল্যই ছিল না। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার জন্য মানুষ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সামান্য কিছুও কেনা যেত না। এর থেকে বোঝা যায়, একটি দেশের অর্থনীতি যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তখন সরকার কতটা অসহায় হয়ে যায়। এই ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট কেবল একটি সংখ্যা ছিল না, এটি ছিল লাখ লাখ মানুষের স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক, তাদের নিত্যদিনের কষ্টের দলিল। আমি যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়, মানুষকে এতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে শুধুমাত্র একটি ভুল অর্থনৈতিক নীতির কারণে।

সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব: টিকে থাকার সংগ্রাম

মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষ। আমি যখন এ সম্পর্কে পড়ি, তখন আমার হৃদয়ে ব্যথা হয়। জিম্বাবুয়ের অতি-মুদ্রাস্ফীতির সময় মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়েছিল, অবসরকালীন ভাতা মূল্যহীন হয়ে গিয়েছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম রকেটের গতিতে বাড়ছিল, কিন্তু মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছিল না। ফলে দরিদ্রতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আমার মনে হয়, এই সময়টায় মানুষজন শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিল, ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিল না। অনেকেই নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছিল একটু ভালো জীবনের আশায়। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছিল না, চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। একটি স্থিতিশীল জীবনযাপনের জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই তখন অনুপস্থিত ছিল। এই ধরনের অর্থনৈতিক সংকট কেবল সংখ্যা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার উপর চরম আঘাত হানে।

বহুমুখী মুদ্রার যুগ: এক অস্থির সমাধান

২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের সরকার যখন বুঝতে পারল যে নিজস্ব মুদ্রা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, তখন তারা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়—নিজস্ব মুদ্রা বাদ দিয়ে বিদেশি মুদ্রা ব্যবহার শুরু করে। আমার নিজের মতে, এটা ছিল এক অস্থির পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য নেওয়া একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ। এর ফলে জিম্বাবুয়েতে মার্কিন ডলার, দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ড, ইউরো এবং অন্যান্য কিছু বিদেশি মুদ্রা অফিসিয়াল লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে। আমি যখন এমন সিদ্ধান্তের কথা ভাবি, তখন মনে হয়, একটি দেশ যখন নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তারা সবকিছু ছেড়ে দিতে প্রস্তুত থাকে। এই পদক্ষেপের ফলে মুদ্রাস্ফীতি রাতারাতি নিয়ন্ত্রণে আসে, কারণ বিদেশি মুদ্রার মূল্য স্থিতিশীল ছিল। মানুষজন আবার তাদের ক্রয়ক্ষমতা ফিরে পায় এবং বাজারে এক ধরনের আস্থা ফিরে আসে। কিন্তু এর কিছু নিজস্ব সমস্যাও ছিল, যা পরে দেখা দেয়।

সময়কাল মুদ্রা প্রধান বৈশিষ্ট্য
১৯৬৪-১৯৮০ রোডেশিয়ান ডলার ব্রিটিশ শাসনের অধীনে, তুলনামূলক স্থিতিশীল
১৯৮০-২০০৯ জিম্বাবুয়ে ডলার (১ম-৪র্থ) স্বাধীনতার পর চালু, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার নোট
২০০৯-২০১৯ বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থা মার্কিন ডলার, র্যান্ডসহ বিদেশি মুদ্রা ব্যবহার, স্থিতিশীলতা
২০১৬-২০১৯ বন্ড নোট ও কয়েন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের স্থানীয় বিকল্প, বৈদেশিক মুদ্রার অভাব
২০১৯-২০২৪ RTGS ডলার / জিম্বাবুয়ে ডলার (ZWL) স্থানীয় মুদ্রা পুনঃপ্রবর্তন, আবারও মুদ্রাস্ফীতির চাপ
২০২৪-বর্তমান জিম্বাবুয়ে গোল্ড (ZiG) স্বর্ণ-সমর্থিত নতুন মুদ্রা, স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা

ডলারের সুবিধা এবং নিজস্ব মুদ্রার অনুপস্থিতি

বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থা জিম্বাবুয়েকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচালেও, এর কিছু বড় সমস্যাও ছিল। আমি যখন এই ধরনের মডেল নিয়ে চিন্তা করি, তখন দেখি যে, নিজস্ব মুদ্রা না থাকলে একটি দেশ তার নিজস্ব মুদ্রানীতি পরিচালনা করতে পারে না। সুদের হার বা মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকে না, যা অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বাহ্যিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। মানুষ হয়তো স্থিতিশীলতা পেয়েছিল, কিন্তু সরকারের হাত থেকে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, এটি ছিল একটি দ্বিধার তলোয়ারের মতো – একদিক থেকে মুক্তি, কিন্তু অন্যদিক থেকে নতুন পরাধীনতা। এছাড়া, ছোটখাটো লেনদেনের জন্য খুচরো বিদেশি মুদ্রা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে বেশ ভোগান্তিতে ফেলেছিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে, নিজস্ব শক্তিশালী মুদ্রা ছাড়া একটি দেশের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন।

বন্ড নোটের আগমন: একটি সমাধান না আরও জটিলতা?

২০১৬ সালের দিকে জিম্বাবুয়ে সরকার বন্ড নোট এবং বন্ড কয়েন চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন ডলারের খুচরো সংকট কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতির লেনদেন সহজ করা। আমি যখন এই ধরনের বিকল্প মুদ্রার কথা শুনি, তখন মনে হয়, এটি হয়তো একটি সংকট সমাধানের চেষ্টা, কিন্তু প্রায়শই এটি আরও জটিলতা তৈরি করে। এই বন্ড নোটগুলো মার্কিন ডলারের সমমূল্যের বলে দাবি করা হলেও, দ্রুতই মানুষ এর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। কালোবাজারে এর বিনিময় মূল্য কমে যেতে শুরু করে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও উদ্বেগ বাড়ায়। এটি যেন ঠিক এমন, আপনি কাউকে বিশ্বাস করে কিছু দিলেন, কিন্তু পরে দেখলেন সেই বিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই। বন্ড নোটগুলো একরকম নিজস্ব মুদ্রারই বিকল্প সংস্করণ ছিল, কিন্তু এর পেছনে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সমর্থন না থাকায় এর মূল্য দ্রুতই কমতে থাকে। এর ফলস্বরূপ, বাজারে আবারও কালোবাজারি ও দুটি বিনিময় হার চালু হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। এই পর্বটি দেখিয়েছিল যে, আস্থা ছাড়া কোনো মুদ্রাই সফল হতে পারে না।

Advertisement

স্থানীয় মুদ্রায় প্রত্যাবর্তন ও নতুন চ্যালেঞ্জ

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে জিম্বাবুয়ে সরকার আবারও নিজস্ব মুদ্রা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে সরে এসে তারা RTGS ডলার চালু করে, যা পরে জিম্বাবুয়ে ডলার (ZWL) নামে পরিচিত হয়। আমার মনে আছে, এই খবরটা যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে, তখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল, আবারও কি সেই পুরনো মুদ্রাস্ফীতির দিনগুলোতে ফিরতে চলেছে জিম্বাবুয়ে? আমি যখন এমন বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা ভাবি, তখন বুঝতে পারি যে, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রানীতি পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়া। কিন্তু মানুষের মনে তখনও পুরনো অতি-মুদ্রাস্ফীতির ভয় টাটকা ছিল, ফলে নতুন মুদ্রার ওপর আস্থা তৈরি করাটা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশি মুদ্রার অভাবে এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে নতুন জিম্বাবুয়ে ডলার দ্রুতই তার মূল্য হারাতে শুরু করে।

আবারও মুদ্রাস্ফীতির দুষ্টচক্র

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ২০১৯ সালে জিম্বাবুয়ে ডলার চালু হওয়ার পর আবারও দেশটি মুদ্রাস্ফীতির দুষ্টচক্রে আটকা পড়ে। আমি যখন এই পরিস্থিতি দেখি, তখন মনে হয় যেন একটি পুরনো ছবির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি, বিদেশি মুদ্রার অভাব এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, আর এর ফলস্বরূপ মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করে। মানুষজন আবারও বিদেশি মুদ্রার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। বাজারে দুটি বিনিময় হার দেখা যায়—একটি অফিসিয়াল এবং অন্যটি কালোবাজারের। এই দুটি হারের মধ্যে বিরাট পার্থক্য ছিল, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য এবং মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য ব্যাপক জটিলতা তৈরি করে। আমার মতে, এই সময়টা জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে আবারও এক অনিশ্চয়তার মেঘ নিয়ে আসে, যা মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। একটি স্থিতিশীল মুদ্রা ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি থাকে না, এই সত্যটি আবারও প্রমাণিত হয়।

ডিজিটালাইজেশন ও নতুন মুদ্রার কৌশল

짐바브웨 화폐 역사 관련 이미지 2

সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ে সরকার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আমার নিজের চোখে দেখেছি, কিভাবে সারা বিশ্বে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম জনপ্রিয়তা লাভ করছে। জিম্বাবুয়েও এই পথে হাঁটছে। মোবাইল মানি এবং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি বেশ প্রচলিত হয়েছে, যা নগদ টাকার অভাব কিছুটা পূরণ করতে সাহায্য করছে। এর পাশাপাশি, সরকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নতুন করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। ২০২৪ সালে জিম্বাবুয়ে সরকার একটি নতুন স্বর্ণ-সমর্থিত মুদ্রা, জিম্বাবুয়ে গোল্ড (ZiG) চালু করেছে। আমি যখন এই ধরনের নতুন উদ্যোগের কথা শুনি, তখন মনে হয়, এটা হয়তো পরিস্থিতির উন্নতির জন্য একটি আশার আলো। এই ZiG-কে মার্কিন ডলারের সাথে সংযুক্ত রাখা হচ্ছে এবং এটি স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতু দ্বারা সমর্থিত। এর উদ্দেশ্য হলো মুদ্রাকে স্থিতিশীল করা এবং মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া। এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ, এবং এর ফলাফল দেখার জন্য আমি নিজেও বেশ আগ্রহী।

ভবিষ্যৎ অর্থনীতির পথে: শিক্ষা ও সম্ভাবনা

জিম্বাবুয়ের মুদ্রার এই দীর্ঘ এবং উত্থান-পতনের ইতিহাস আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শিক্ষা দেয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যেকোনো দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলো মানুষের আস্থা। যখন মানুষ নিজের মুদ্রার উপর আস্থা হারায়, তখন সেই অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা ভেঙে পড়বেই। জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, সরকারের স্বচ্ছতা, শক্তিশালী মুদ্রানীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সুসম্পর্ক একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য কতটা অপরিহার্য। আমি যখন এই পুরো যাত্রাপথটা নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়, জিম্বাবুয়ে বারবার চেষ্টা করেছে, ভুল করেছে এবং আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। এটি একটি জাতির টিকে থাকার অদম্য স্পৃহার গল্প। ভবিষ্যৎ জিম্বাবুয়ের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও, আমি বিশ্বাস করি, এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত শিক্ষা তাদের সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারে।

স্থিতিশীলতার জন্য পদক্ষেপ

জিম্বাবুয়ে বর্তমানে তাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। নতুন মুদ্রা ZiG-এর মাধ্যমে তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে। আমি যখন শুনি যে, একটি দেশ তাদের অতীত ভুলগুলো থেকে শিখছে, তখন আমার খুব ভালো লাগে। সুসংগঠিত অর্থনৈতিক নীতি, বাজেট শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা যেকোনো দেশের জন্য উন্নতির সোপান। জিম্বাবুয়ের ক্ষেত্রেও এই নীতিগুলো প্রয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে তারা একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর সাথে গঠনমূলক আলোচনা এবং সহায়তার মাধ্যমে তারা হয়তো সঠিক পথ খুঁজে পাবে। এটি কেবল মুদ্রার স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, এটি লাখ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্ন।

পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভূমিকা

জিম্বাবুয়ের প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরন্ত। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের মতো বিশ্ববিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র থেকে শুরু করে মূল্যবান খনিজ সম্পদ—সবকিছুই দেশটির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষমতা রাখে। আমার মতে, পর্যটন এবং খনিজ সম্পদ আহরণ জিম্বাবুয়ের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদি এই খাতগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, তবে দেশ দ্রুতই অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে পারে। স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। আমি দেখেছি, পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সম্পদের উপর নির্ভর করে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। জিম্বাবুয়েও সেই পথে হাঁটতে পারে, যদি তারা সঠিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এটি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, এটি একটি জাতির সামগ্রিক সমৃদ্ধির গল্প হতে পারে।

Advertisement

উপসংহার

জিম্বাবুয়ের মুদ্রার এই দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল যাত্রা আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব সম্পর্কে এক অমূল্য শিক্ষা দেয়। আমি এই পুরো বিষয়টিকে কেবল সংখ্যার খেলা হিসেবে দেখি না, বরং এটি একটি জাতির টিকে থাকার সংগ্রাম, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মুদ্রার প্রতি মানুষের আস্থা কতটা জরুরি, সঠিক নীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম – এই সবকিছুই জিম্বাবুয়ের ইতিহাস থেকে আমরা শিখতে পারি। ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জিং হলেও, এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে অর্জিত জ্ঞান জিম্বাবুয়েকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমার মতে, প্রতিটি দেশেরই এই গল্প থেকে কিছু শেখার আছে, যেন এমন পরিস্থিতি আর কারো জীবনে না আসে।

কাজের কিছু তথ্য যা আপনার জানা উচিত

১. মুদ্রার স্থিতিশীলতা: যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে একটি স্থিতিশীল মুদ্রা কতটা জরুরি, জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা তা আমাদের শিখিয়েছে। যদি আপনার নিজস্ব মুদ্রার উপর আস্থা না থাকে, তাহলে তা আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

২. মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব: অতি-মুদ্রাস্ফীতি আপনার সমস্ত সঞ্চয়কে মুহূর্তের মধ্যে মূল্যহীন করে দিতে পারে। তাই, আপনার আর্থিক পরিকল্পনায় সবসময় মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিন এবং সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন থাকুন।

৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা: একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের সিদ্ধান্ত সরাসরি আপনার আর্থিক জীবনে প্রভাব ফেলে।

৪. সম্পদের বৈচিত্র্যকরণ: আপনার সমস্ত সম্পদ এক জায়গায় না রেখে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করুন। সোনা, রিয়েল এস্টেট বা বিদেশি মুদ্রার মতো সম্পদে বিনিয়োগ করে আপনি অর্থনৈতিক সংকট থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।

৫. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে সাহায্য করে।

Advertisement

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সারসংক্ষেপ

বন্ধুরা, জিম্বাবুয়ের মুদ্রার এই ঐতিহাসিক যাত্রার দিকে তাকালে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই। ঔপনিবেশিক আমলের রোডেশিয়ান ডলার থেকে শুরু করে স্বাধীন জিম্বাবুয়ের আশার প্রতীক জিম্বাবুয়ে ডলার, তারপর ভূমি সংস্কারের প্রতিক্রিয়া এবং অতি-মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতা — এই সবকিছুই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোটের সেই দুঃখজনক ঘটনাটি আজও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এরপর বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থার মাধ্যমে এক অস্থির স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর, আবারও নিজস্ব মুদ্রায় ফিরে আসার চেষ্টা এবং সর্বশেষ স্বর্ণ-সমর্থিত ZiG মুদ্রার প্রবর্তন – এই পুরো পথটিই ছিল এক নিরন্তর সংগ্রাম।

মূলত, এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে, একটি স্থিতিশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা অপরিহার্য। সরকারের স্বচ্ছতা, কার্যকর মুদ্রানীতি এবং জনগণের আস্থা – এই তিনটি স্তম্ভ ছাড়া কোনো অর্থনীতিই টেকসই হতে পারে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জিম্বাবুয়ে এই দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে প্রাপ্ত শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। প্রতিটি সংকটই নতুন করে শেখার সুযোগ নিয়ে আসে, আর জিম্বাবুয়ের এই গল্প আমাদের সবাইকে সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর অনুপ্রেরণা জোগায়। আমাদের নিজেদের জীবনেও যখন কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নিই, তখন জিম্বাবুয়ের এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষা আমাদের সাহায্য করতে পারে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖

প্র: জিম্বাবুয়ের মুদ্রাস্ফীতির পেছনের মূল কারণগুলো কী ছিল এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কী ধরনের প্রভাব পড়েছিল?

উ: জিম্বাবুয়ের ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির গল্পটা truly অবিশ্বাস্য। আমার যখন প্রথম এই বিষয়ে পড়া শুরু করি, আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম! ২০০০ এর দশকের শুরুতে ভূমি সংস্কার নীতির কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন ভীষণভাবে কমে যায়, যা ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড। সরকার তখন এই ঘাটতি পূরণ করতে এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে লাগামহীনভাবে টাকা ছাপাতে শুরু করে। বাজারে যখন অতিরিক্ত টাকা চলে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই টাকার মূল্য কমতে শুরু করে আর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। বিদেশী বিনিয়োগও কমে গিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছিল।এর ফলাফল ছিল মারাত্মক। মানুষ এক বেলার বাজার করতেও বস্তা ভর্তি টাকা নিয়ে যেত, কারণ ডলারের মূল্য এত দ্রুত বাড়ত যে আজকের টাকার দাম কাল প্রায় অর্ধেক হয়ে যেত। আমি শুনেছি এমন গল্প যেখানে মানুষ সকালে বেতন পেয়ে দুপুরে জিনিসপত্র কিনত, কারণ বিকেলে সেই টাকার দাম আরও কমে যাবে। একসময় অবস্থা এমন হয় যে এক ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলারের নোটও সামান্য কিছু কেনার জন্য যথেষ্ট ছিল না!
এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে চলত, তাদের জীবন একরকম নরকে পরিণত হয়েছিল। বহু মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়েছে, চাকরি হারিয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খেয়েছে। অনেকে শেষ পর্যন্ত বিদেশি মুদ্রায়, বিশেষ করে মার্কিন ডলারে লেনদেন শুরু করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিল। আমার নিজের মনে হয়, এমন চরম অর্থনৈতিক সংকট একটি জাতিকে ভেতর থেকে কতটা নাড়িয়ে দিতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

প্র: এই চরম মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলা করতে জিম্বাবুয়ে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সেগুলো কতটা সফল হয়েছিল?

উ: এই বিপর্যয় থেকে বের হয়ে আসতে জিম্বাবুয়ে সরকারকেও বেশ কয়েকবার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। প্রথম এবং সবচেয়ে নাটকীয় পদক্ষেপ ছিল ২০০৯ সালে নিজস্ব মুদ্রা বাতিল করে ‘ডলারাইজেশন’ গ্রহণ করা। এর মানে হলো, তারা মার্কিন ডলার, দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ডসহ অন্যান্য স্থিতিশীল বিদেশি মুদ্রাগুলোকে দেশের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করে। এই পদক্ষেপের কারণে অর্থনীতির কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং মুদ্রাস্ফীতির দানবীয় গতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসে। আমার মনে আছে, তখন অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।তবে, বিদেশি মুদ্রা ব্যবহারেরও নিজস্ব কিছু সমস্যা ছিল। বাজারে নগদ অর্থের অভাব দেখা দেয়, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব মুদ্রা ছাপানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে ২০১৬ সালে সরকার ‘বন্ড নোট’ চালু করে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন ডলারের সমমূল্যের বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষ এর ওপর আস্থা রাখতে পারেনি, এবং বন্ড নোটের মূল্য দ্রুত কমে যায়। এরপর ২০১৯ সালে তারা আবার নিজস্ব মুদ্রা, যা তখন RTGS ডলার বা নতুন জিম্বাবুয়ে ডলার নামে পরিচিত ছিল, চালু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই মুদ্রাও অচিরেই তার মূল্য হারায় এবং মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই পুরো ঘটনা দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝতে পারি যে শুধুমাত্র মুদ্রা পরিবর্তন করলেই হয় না, মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করাটা আসল চ্যালেঞ্জ।

প্র: বর্তমানে জিম্বাবুয়ের মুদ্রাব্যবস্থা কেমন এবং তারা কি অবশেষে একটি স্থিতিশীল সমাধান খুঁজে পেয়েছে?

উ: সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ে আবারও একটি নতুন মুদ্রার সঙ্গে পথচলা শুরু করেছে, যা ‘জিম্বাবুয়ে গোল্ড’ বা সংক্ষেপে ZiG নামে পরিচিত। এটি ২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আগের ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমার মনে হয়, এবার তারা বেশ সিরিয়াস।ZiG এর বিশেষত্ব হলো, এটি দেশের সোনা এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দ্বারা সমর্থিত একটি ‘কাঠামোগত মুদ্রা’ (structured currency)। এর মানে হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করেছে যে ZiG এর মূল্য সোনার মজুদ এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে। এটি মানুষের আস্থা অর্জনের একটি প্রচেষ্টা, যাতে তারা মনে করে যে এই নতুন মুদ্রার পেছনে একটি বাস্তব সমর্থন রয়েছে। সরকার আশা করছে যে এটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনবে। তবে, এটি কতটুকু সফল হবে তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, অতীতে বহুবার এমন চেষ্টা হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ আস্থা রাখতে পারেনি। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, শুধুমাত্র নতুন মুদ্রা চালু করলেই হবে না, বরং শক্তিশালী অর্থনৈতিক নীতি, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, ZiG এর ভবিষ্যৎ কী হয় তা দেখার জন্য। আশা করি, এবার জিম্বাবুয়ের মানুষের জীবনে সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরে আসবে।

📚 তথ্যসূত্র